ফুলের স্বর্গরাজ্য “ভার্সে” একদিন
—-----------------------------
রবিবার , ১১ এপ্রিল ২০২১
করোনার লক-ডাউনে দমবন্ধ হয়ে বেশ কয়েক মাসে একেবারে হাপিয়ে উঠেছিলাম। সেই জন্য লক-ডাউন উঠতেই বেরিয়ে পড়লাম মন ভালো করতে পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। একবার উত্তর বঙ্গ গিয়ে কোথাও একটা গেলেই হলো, আসল লক্ষ্য তো ছুটি কাটানো ফলে যে কোনো একটা জায়গায় গেলেই হল।
সেই মতো তৎকালে উত্তর বঙ্গের টিকিট কেটে দুই জন অর্থাৎ আমি ও গৌতম দা ট্রেনে চড়ে পড়লাম। পদাতিক এক্সপ্রেস, রাত্রি সাড়ে ৯ টা নাগাদ ছেড়ে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছাবে সকাল ৯ টায়। ট্রেনে উঠে ঠিক করলাম এবার একটু অফবিট জায়গায় যাওয়া যাক। সাথে গতমাসের ভ্রমন পত্রিকা ছিল আর সেটা থেকে জানলাম পশ্চিম সিকিমের ভার্স নামক একটা জায়গায় এই সময় প্রচুর ফুল ফুটবে। তার সাথে থাকবে একটি এক প্রকার সোজা ট্রেক। ব্যাস কোথায় যাবো ঠিক হয়ে গেলো। কিভাবে যেতে হবে, কোথায় থাকতে হবে সেসব তথ্যও পেলাম সেই গাইড থেকে।
সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১
গতকাল খুব একটা ভাল ঘুম হয়নি। ট্রেন একটু লেট করে পৌছালো ১০ টা নাগাদ।
নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে প্রথমে আমরা বাসের খোঁজ করলাম, দিনে মাত্র দুটো বাস চলে। সকালেরটা চলে গিয়েছে আর পরের টা বিকালে। অগত্যা ভরসা শেয়ার গাড়ি। আমরা সিট পেলাম মাঝের লাইনে। প্রায় ৪ ঘণ্টা এভাবে চলার পর পৌঁছলাম জোরথাং নামক একটা জায়গায়। সেখান থেকে গাড়ি বদল করে যেতে হবে। এবারে সিট আরও খারাপ, একেবারে পেছনের লাইনে মাঝের একটা সিট। ঘুরতে গেলে এমন অনেক কিছুই মানিয়ে নিতে হয়, ফলে এসব নিয়ে ভাবলে চলে না। এবারে রাস্তা আগের থেকে আলাদা। গাড়ি ওপরে উঠছে তো উঠছেই। ওপরে ওঠা যেন শেষই হয় না। কতগুলো পাহাড় যে এভাবে পার হলাম তার গুন্তি নেই। জোরথাং এ বেশ গরম লাগছিল আর এখন বেশ শীত লাগছে। প্রায় ৩ টা নাগাদ আমাদের গাড়ি সোমবাড়িয়া নামক একটা বাজারে থামল। ড্রাইভার জানালো এই পথের এটাই শেষ বাজার, এর পর ছোটোখাটো দোকান থাকলেও আর কোনো বাজার নেই, সেই জন্য কিছু কিনবার থাকলে যেন কিনে নি।
সোমবাড়িয়া বেশ বড় বাজার আর প্রায় পুরোটাই রাস্তার পাশ দিয়ে। এখানে হরেক জিনিস পাওয়া যাচ্ছে। বাজারের ভেতরেই একটা স্টেজ এ কিছু একটা খেলা চলছে। নেপালি ভাষায় মাইকে কিছু বলছে আর অনেক মানুষ সেই স্টেজ এর সামনে কাগজ ও পেন নিয়ে বসে।নেপালী আমি বুঝি না, তবে ভাষা না বুঝলেও হাবেভাবে বুঝলাম যে এটা এক ধরনের লটারি। আমি ও গৌতম’দা কিছুক্ষন ঘুরে লোকাল দোকান থেকে চা খেয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। ইতিমধ্যে বাইরে বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আমাদের গাড়ির বিশ্রাম ছিল ১০ মিনিটের, অথচ প্রায় আধাঘন্টা পেরিয়ে গেলেও সহযাত্রীদের ফিরবার কোনও খবর নেই। প্রায় ৪৫ মিনিট বাদে একে একে তারা ফিরতে শুরু করলেন। সকলের হাতে বাজারের ব্যাগ, সম্ভবত সপ্তাহের বাজার করে ফিরেছে। আমাদের ড্রাইভার ফিরলেন সবচেয়ে পরে, প্রায় ৫০ মিনিট কাটিয়ে। ড্রাইভার আনন্দের সঙ্গে জানিয়ে দিল সে দুই দান জুয়ো খেলেছে ও জিতেছে, তাই একটু দেরি। সব দেখে বুঝলাম যে এটা আসলে স্থানীয় হাট, সোমবারে বসে আর এর থেকেই জায়গার নাম সোমবাড়িয়া।
আবার শুরু হল আমাদের যাত্রা। সোমবাড়িয়া এর আশেপাশেও একটু সমতল ছিল কিন্তু এবারে একেবারে খাঁড়াই রাস্তা। মনে হচ্চিল আর কত উপরে উঠব আমরা? এত যেন স্বর্গের কাছে চলে এলাম। ইতিমধ্যেই শীত বেশ জাকিয়ে পড়েছে। ব্যাগের থেকে গরম জ্যাকেট, মাফলার এসব ইতিমধ্যেই গায়ে চাপিয়েও কাঁপছি। পাহাড়ের চূড়াতে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। রাস্তার পাশে দেখতে পেলাম লাল - হলুদ রডোডেনড্রন ফুল ফুটে রয়েছে। গাড়ি চললো আরো প্রায় এক ঘন্টা।
প্রায় পৌনে ৫ টা নাগাদ এক যাত্রী সামনের সিট থেকে নেমে গেলে আমি সেখানে গিয়ে বসলে একটু যেন আরাম পেলাম। এখানে ঠান্ডা হাওয়া কম আর ইঞ্জিনের গরম বেশ আরামদায়ক। গাড়ির ড্রাইভার জানতে চাইলেন আমরা কোথায় থাকব। আমাদের হোমস্টে এর নাম জানতাম, সেটা বলায় তিনি একটু পরে একটা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেখিয়ে দিলেন সামনের একটা বাড়ি। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম আর গাড়ির থেকে নামতেই ঠান্ডা যেন জ্যাকেট ফুরে ভেতরের হাড় যেন জমিয়ে দিল।
আমাদের হোমস্টের নাম রিনচেন। বাড়িটি আংশিক কাঠের ও ইটের তৈরী। বুঝলাম পুরোনো কাঠের বাড়ি আস্তে আস্তে বদলে ইটের তৈরি হচ্ছে। পরে জেনেছিলাম এসব ইট আসে শিলিগুড়ি থেকে আর এতটা পথ আসতে গিয়ে তার দাম খুবই বেড়ে যায়।
আমাদের ঘর দেখিয়ে দিলেন মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি। একটু পরেই একটি মেয়ে চা ও পেঁয়াজি জাতীয় একটা ভাজি নিয়ে এলো। তার বয়স সম্ভবত ২৩/২৪ হবে। পাহাড়ি মেয়েরা যেমন ফর্সা হয় ইনিও তেমনই ফর্সা ও ছিপছিপে। কথায় কথায় জানলাম তার নাম রিনচেন, আর আমাদের হোমস্টে এর নামও ও রিনচেন! জিজ্ঞাসা করলে বলল এই হোমস্টে তারই নামে। তবে বাড়িটি তার দাদা’র। দাদাই বোনকে ভালোবেসে বোনার নামেই এই হোমস্টে করেছে।
চা পান শেষ হলে আমাদের রিনচেন তাদের গ্রাম ঘুরে দেখবার প্রস্তাব দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়তাম রিনচেন এর সাথে তাদের গ্রাম ঘুরে দেখতে। গ্রামটির নাম ওখরে। এই গ্রামে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, একটি স্কুল, দুই একটি দোকান, ও সম্ভবত ৫০/৬০ টি পরিবার বাস করে। এক জায়গা থেকে দূরে কয়েকটি পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে বলল ওই পাহাড়গুলি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে। ও তার মানে আমরা ঘুরেফিরে আবার পশ্চিমবঙ্গের সীমানার কাছেই রয়েছি। এর পর আমাদের নিয়ে চলল গ্রামের উপরের দিকে , সেখানে রয়েছে গ্রামের স্কুলটি। এর স্কুলে রিনচেন নিজেও পড়েছে আর বর্তমানে সেই সেখানের অঙ্কের শিক্ষক। রিনচেন এর কথা বলবার ধরন খুবই মিষ্টি ও মার্জিত। শিক্ষার প্রতিফলন রয়েছে তার আচার ও ব্যবহারে। আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মেয়ের মতো মোটেই নয়। কিছুক্ষনের মধ্যেই সন্ধ্যা নামলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা কেমন যেন ঝুপ করে নাম, ঠিক সমতলের মতো নয়। রিনচেন উপরের দিকে দেখিয়ে বললো ওখানে রয়েছে একটি মনস্ট্রী। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে ফলে সেখানে এখন আর যাওয়া যাবে না। আমাদের ওখরে গ্রাম ভ্রমণ আপাতত মুলতুবি রেখে আবার হোমস্টে ফিরবার রাস্তা ধরলাম। ফিরবার পথে এক জায়গা কুয়াশা এতো গাঢ় যে পাঁচ হাত দূরের কিছু দেখাই কঠিন। রিনচেন রাস্তা চেনে তাই আমাদের নিয়ে এলো নইলে এমন অন্ধকার ও কুয়াশার কারণে আমরা ফিরতেই পারতাম না।
রাত্রের খাবার এলো প্রায় ৯ টা নাগাদ। পাহাড়ে রাত্রি ৯ টাই যেন মধ্য রাত্রি। খাবারে ভাত, ডাল, একটা ভাজি,রুটি একটা সবজি ও মুরগির মাংস পরিবেশন করলো। খাবার বেশ ভাল। সারাদিনে ভাল ভাবে খাবার খাওয়া হয়নি যার জন্য এই খাবার মনে হলো যেন অমৃত। খাবার খেতে খেতে রিনচেনদের বাড়ির ও গ্রামের গল্প শুনছিলাম। এটা জেনে বড়ই অবাক হলাম যে রিনচেনরা কখনও কলকাতার মতো বড় শহর দেখেনি। এদের এখানে কলকাতা থেকে মানুষ ঘুরতে আসে তাদের থেকে কলকাতার গল্প শুনেছে। শুনেছে খুব ভিড়, অনেক গাড়ি , অনেক উঁচু বাড়ি। তবে এনারা একবার শিলিগুড়ি গিয়েছিলেন, খুব ভিড়, গাড়ি, শব্দ এসব সহ্য হয়নি। পরের দিনই শিলিগুড়ি শহর ছেড়ে আবার গ্রামে ফিরে এসেছিল। ডিশ টিভি আসবার আগে এখানে মানুষের আমোদ আনন্দ করবার মতো প্রায় তেমন কিছুই ছিলো না। একটা সিনেমা হল রয়েছে সেই সোমবাড়িয়ায় আর কাছের কলেজও সেখানেই। কিন্তু সেও তো অনেক রাস্তা। বাসে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা তারপর বাসের সংখ্যায়ও খুবই কম। যে কারণে অনেকেই এখানে ১২ ক্লাসের পর আর পড়াশোন করে না। রিনচেন সেখানের একটা কলেজ থেকেই গ্রাডুয়েশন করেছে। এপ্রিল মাসের ঠান্ডায় আমরা কাবু হয়ে পড়ছি দেখে হেসে জানাল এখন তো ঠান্ডাই নেই। শীত পড়ে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। গত বছর নভেম্বরের মাঝেই প্রথম তুষার পাত হয়েছিল। সেসব সময় খুবই ঠান্ডা থাকে। রাস্তা বরফের ফলে আটকে যায়। গাড়ি চলা বন্ধ হয়ে পড়ে। খাবার ওষুধ নিচে শহর থেকে আসতে পারে না। তখন এনাদের নিজেদের জমানো খাবার যা মূলত আটা, ভুট্টা, শুকর ও গরুর মাংস আর তার সাথে সাধারণ চাল ডাল জাতীয় খাবার খায়। এই সময় জল ঠান্ডায় জমে যায় বলে জলের সমস্যা মারাত্মক হয়ে পড়ে। তবে সব চেয়ে অসুবিধা হয় যদি এই সময় কেউ অসুস্থ হয়ে যায় ও তাঁকে নিচে বড় শহরে নিয়ে যাবার প্রয়োজন হয়। কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল আমরা যারা সমতলে বড় শহরে থাকি তার কতই না আরামে থাকি সেটা এনাদের অসুবিধার কথা জেনে বুঝতে পারলাম। অথচ সেসব জীবন নিয়েই আমাদের অভিযোগের শেষ নেই! হয়তো আরামে থাকতে থাকতে অসুবিধা যে কি জিনিস সেই বোধটাই আমাদের নষ্ট হয়ে যায়।
মঙ্গলবার , ১৩ এপ্রিল ২০২১
পরের দিন বেশ ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো, রাত্রে খুব ভাল ঘুম হয়নি। খুবই ঠান্ডা লাগছিল। রাত্রে হয়ত শূন্যের নিচে চলে গিয়েছিল তাপমাত্রা। সকালে রিনচেন চা দেবার সময় জানাল গতকাল রাত্রে সম্ভবত লেপার্ড এসেছিল। এখানে মাঝে মাঝেই লেপার্ড চলে আসে। আর সে এও জানাল এই কারণেই সন্ধ্যার পর আমাদের গ্রামের মনেস্ট্রি নিয়ে যায়নি। তবে খুব ভোরে গৌতমদা একাই মনেস্ট্রি ঘুরে এসেছে। গৌতমদা বরাবরই খুব ভরে ঘুম থেকে ওঠে এখানেও সেই অভ্যাস।
আজ আমরা রডোডেনড্রন ফুলের স্বর্গ ভার্সে দেখতে যাব। রিনচেনদের গ্রাম থেকে সেখানে যাবার জন্য শেয়ার গাড়ি চলে না, প্রাইভেট গাড়ি বুক করতে হয়। আমরা গতকাল রাত্রেই রিনচেনদের মাধ্যমে একটা ছোট গাড়ি ও গাইড বুক করে নিয়েছিলাম। সকালের খাবার খেতে খেতেই তারা চলে এলো। রিনচেনদের হোমস্টে থেকে আমাদের যেতে হবে হিলে নামক একটা জায়গায়। মোট দূরত্ব ১২/১৩ কিলিমিটার মতো। জায়গাটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে।
চটপট সকালের খাবার খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। একটু পরেই জঙ্গলের রাস্তা শুরু হলো। জঙ্গলের মধ্যে দেখলাম রংবেরঙের অতি সুন্দর এক বনমোরগ, আমাদের গাড়ির সামনে দিয়ে ছুটে চলে গেল। আরেকটু যাবার পরই যেখানে পাহাড়ের ছায়া পড়ছে সেখানে দেখতে পেলাম জমে থাকা বরফ। আজও বরফ রয়েছে এখানে! বরফের কাছে যাবার কথা বলতে আমাদের গাইড বারণ করলো। সে জানাল এই সব জায়গায় অনেক জংলী জানোয়ার রয়েছে তাই তারা কেউ এখানে খুব দরকার না হলে গাড়ি থেকে নামেনা। কিছুক্ষন পরে আমরা পৌঁছলাম হিলে।
হিলে জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট জায়গা। যেখানে রয়েছে দুই-তিনটি হোটেল, চা বা ম্যাগি জাতীয় খাবারের দোকান ও ভার্সে যাবার টিকিট কাউন্টার। এখানে কেউ স্থায়ী ভাবে থাকে না। সকালে সবাই আসে ভার্স ঘুরে আবার বিকালের আগে ফিরে যায়। তবে হোটেলগুলোতে মানুষ থাকে। কিন্তু গরমের সময় বাদে সেভাবে ভিড় হয়না।
নিমা আমাদের এই সফরের গাইড। রোগা চেহেরার ছোট আকৃতির নিমার প্রধান জীবিকা টুরিস্ট গাইড। সারা বছর টুরিস্ট দের গাইড করেই তার দিন চলে। নিমা আমাদের জানালো টিকিট কাউন্টার থেকে আমাদের দুই জনের টিকিট নিতে কারণ এখানে গাইডদের টিকিট লাগে না।
ভার্সের টিকিট কেটে আমাদের যাত্রা শুরু। প্রায় ৪ কিলোমিটার হেটে যেতে হবে এই পাহাড়ি জঙ্গল পথে তবেই দেখা মিলবে রডোডেনড্রন ফুলের স্বর্গ। এমন একটা জায়গা যেখানে চারি দিক চেয়ে রয়েছে লাল হলুদ আরও অনেক রঙের ফুলে। গেট পার হয়ে একটু দূর এসেই দেখা পেলাম প্রথম গুরুঞ্চ বা রডোডেনড্রন ফুলের। জঙ্গলের মধ্যে চারিদিক একেবারে নিস্তব্দ, রয়েছে শুধু হাওয়ার জন্য পাতায় পাতায় ঘষা লাগবার শব্দ আর তারসাথে পাখিদের মিষ্টি সুরের ডাক। প্রথমে কিছুটা সিঁড়ি ভেঙে উঠে তারপর মরম বিছানো রাস্তা। রাস্তা সরু তার একদিকে পাহাড়ের ঢাল অন্য দিকে গভীর গিরিখাত। জায়গায় জায়গায় জঙ্গল খুবই গভীর, যেন সূর্যের আলোও এখানে ঢুকতে পারে না। এই জঙ্গলে বিভিন্ন ধরণের গাছ রয়েছে। তারমধ্যে পাইন, সেগুন, রডোডেনড্রন ও বাঁশ এর বন। রাস্তার ওপর দিয়েই বয়ে চলেছে বরফগলা ছোট ঝর্ণার জল আবার কোথাও মরা গাছ ভেঙে রাস্তার ওপর পড়ে রয়েছে। পাইন বনের মধ্যে কুয়াশা যেন খেলে জায়গাটা যেন মায়াবী করে তুলেছে।
আমাদের গাইড হটাৎ রাস্তা থেকে একটা ফল তুলে আমাদের দেখিয়ে বলল, এই ফল ভাল্লুরকের খুবই পছন্দ। আর একটা দেখে মনে হচ্ছে ভাল্লুকই খেয়েছে। আশেপাশে এই একই ফল অনেকগুলো পড়েছিল। ভাল্লুক ফল খেয়েছে মানে হতে তো পারে সে এখনো আশেপাশেই রয়েছে। বিষয়টা ভেবেই বেশ ভয় ভয় করে উঠলো। আমাদের গাইড আস্বস্ত করে বললো যে না ভাল্লুক থাকলেও দিনের বেলায় ভয় নেই। আর আরো জানালো এর মধ্যে হরিণ-লেপার্ড এর মতো জানোয়ারও থাকে। তবে এই জঙ্গলের সব চেয়ে আকর্ষণীয় হলো রেড পান্ডা। রেড পান্ডা বিলুপ্তপ্রায় এক প্রাণী তবে এখনও এই জঙ্গলে মাঝে মাঝে দেখা যায়। নিমা, সে নিজেও কয়েকবার রেড পান্ডা দেখেছে, বাঁশের পাতা রেড পান্ডার খুবই পছন্দ আর সেটা খেতেই পান্ডারা আসে এখানে।
জঙ্গলের মধ্যে হেঁটে চলেছি, কখনও খাড়াই কখনও উৎরাই। আবার মাঝে মাঝে কুয়াশ এসে আমাদের চলার পথ ঢেকে দিচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষন চলবার পরে প্রথম একটা বসে বিশ্রামের জায়গা দেখলাম। পথ চলার শুরুতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তবে কিছুক্ষন চলবার পরে বেশ অভ্যাস হয়ে এলো। তবু বসবার জায়গা দেখে একটু আরাম করে বসে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিলাম। এর মধ্যে কতকগুলি মানুষ মাথার ভারী বোঝা নিয়ে এসে দাঁড়াল। লোকাল লোক, এই জঙ্গলে মুটের কাজ করে। ওপরে একটা হোটেল রয়েছে সেখানে রাত্রিবাস করা যায়। এই লোকগুলি সেখানের জন্য মালপত্র মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় জানালো এক একটি বোঝার ওজন ৫০ কিলোর বেশি। শুনে অবাক হলাম এটা ভেবে যে যেখানে আমরা শুধু হেঁটে উঠতেই হাপিয়ে যাচ্ছি সেখানে এরা এমন বোঝা নিয়ে কিভাবে যাচ্ছে! এখানে যাবার মতো এই একটাই রাস্তা তাও কোথাও উঁচু কোথাও নিচু কোথাও আবার পাথর কেটে সিড়ি আবার কোথায় গর্ত, রাস্তাটাও খুব বেশি হলে ৪ - ফুট চওড়া আবার কোথাও কোথাও তারও কম। ফলে এখানে গাড়ি চলবার কোনও উপায় নেই। ফলে এভাবেই মাল পত্র নিয়ে যাওয়া একমাত্র উপায়। এভাবেই বালি সিমেন্ট রড এসব নিয়ে গিয়ে হোটেল তৈরি হয়েছে, ভেবেই আশ্চর্য হলাম!
কিছুক্ষন বিশ্রামের পর আবার পথ চলা শুরু। রাস্তা তেমনই। একজায়গায় দাড়িয়ে আমাদের গাইড এক দিকে ইঙ্গিত করে বলল এখানের থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে। কিন্তু আজ সেই সৌভাগ্য ছিলো না। আরেকটু পরে রাস্তার থেকে একটু উপরে দেখতে পেলাম মহাদেবের একটা ছোট মন্দির। সেখানে আশেপাশে কেউ না থাকলেও সেখানে তখনও ধুপ জ্বলছিল। হয়তো কেউ একটু আগেই এখানে পুজো দিয়েছে। এই পথেই দেখা পেলাম কলকাতার একটি পরিবারের সাথে। তারা উপরের হোটেল বুক করেছিল কিন্তু সেখানে পৌঁছে কাউকে না পেয়ে ফিরে আসছে। নেটওয়ার্ক নেই ফলে সেখানের থেকে ফোনেও যোগাযোগ করতে পারেনি। মোবাইল চেক করে দেখলাম আমাদের নেটওয়ার্ক এরও একই অবস্থা। নিমা বলল বিএসএনএল বাদে আর করো নেটওয়ার্ক এখানে পাবে না।
না রাস্তায় আর কোথাও আমাদের বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন হলোনা। আমরা একেবারে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছে গেলাম ফুলের স্বর্গে ভার্সে । জায়গাটা পাহাড়ের একেবারে উপরে আর জায়গাটা বেশ সমতল। রাস্তায় যে জঙ্গল ছিলো এখানে সেটা নেই ফলে পরিস্কার আকাশ দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ যে জঙ্গলের রাস্তায় এলাম সেখানে আকাশ ঢেকে দিয়েছিল গাছের পাতা যা এখানে নেই। চারিদিক বিভিন্ন ধরনের রডোডেনড্রন বা গুরুঞ্চ ফুলের গাছ। নিমা বলল এখানে প্রায় ১২/১৪ ধরনের গুরুঞ্চ ফুল রয়েছে। কোনটা লাল কোনটা হলুদ আবার কোনটা বেগুনি বা আর কোনও রঙের।
আমাদের ভাগ্য খুব একটা সুপ্রসন্ন ছিল না। এতটা পথ এসে আমাদের কিছুটা নিরাশ হতে হলো। নিমা জানালো এখানে দুই তিন আগে এসেও সে অনেক ফুল দেখেছে। কিন্তু দুই দিন আগের বৃষ্টি হবার ফলে সেসব ফুল ঝরে গিয়েছে। গাছে নিচে সেসব ফুলের পাপড়ি এখনও দেখা যাচ্ছে। আর গাছে রয়েছে প্রচুর ফুলের কুড়ি যা ফুটতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ লাগবে। তবে একেবারে ফুল নেই তাও নয়। অল্প কিছু ফুল আবার ফুটেছে কিন্তু ভার্সের যে ছবি দেখেছি যে লাল ফুল ফুটে একেবারে জঙ্গলে আগুন লেগে যাবার রূপ সেটা একেবারেই নেই এখন।
জায়গাটা এতই নির্জন যে যেন নিজেদের নিশ্বাসের শব্দও যেন শুনতে পারছিলাম। আশেপাশের থেকে ভেসে আসছিলো বিভিন্ন ধরনের পাখির সুমিষ্ট ডাক। কোনোটা দোয়েলের মতো পাখির আবার কোনোটা আচেনা কোনও সুর। এখানের পাখিগুলি বেশ মোটাসোটা গোলগাল চেহারার হয়তো ঠান্ডার কারণের।
এখানে খাবারের কোনো দোকানের কথা ভাবাই অসম্ভব। যে কারণে হোমস্টে থেকে আমাদের দুপুরের খাবার বানিয়ে দিয়েছিল যেটা আমরা এখানে বসে খেলাম। এতো সুন্দর এক পরিবেশে উষ্ণ চায়ের সাথে আলুপরোটা একেবারে নৈসর্গিক খাবার। বেশ কিছুক্ষন বসে তারপর সামনের দিকে আবার চলতে শুরু করলাম। আমাদের গাইড, নিমা বললো সামনে ফুল পাওয়া যাবে। আর সেই লোভেই চললাম। নিমা আমাদের বিভিন্ন ধরণের গুরুঞ্চ বা রডোডেনড্রন এর গাছ চিনিয়ে দিলো। জানলাম এখানে অনেক ধরণের এমন ফুলের গাছ রয়েছে যার কোনটা ছোট ঝোপের মতো তো কোনটা একটু বড়। ভেবে আশ্চর্য লাগলো যে এখানে এমন পাহাড় এর মাথায় কে এতো সুন্দর করে সব ফুলের গাছ লাগিয়েছে। সত্যি প্রকৃতি কতই না আশ্চর্যের! এই ফুলের বাগান, যেভাবে এখানে ফুলের গাছগুলি রয়েছে তাতে জঙ্গল না বলে বাগানই বলা চলে। সেই বাগান অনেকদূর পর্যন্ত বৃস্তিত। এই গাছগুলির মধ্যে থেকে পায়ে হাটা পথ চলে গিয়েছে সামনের দিকে। আমরা চললাম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সেই পথ ধরে। প্রায় আরো এক কিলোমিটার যাবার পর একটা জায়গা বেশ ফাঁকা। সেখানে রয়েছে একটি হোটেল, নাম গুরুজ-কুঞ্জ। জায়গার সাথে হোটেল এর নামের একেবারে উপযুক্ত।
হোটেলটি বেশ সুন্দর। সামনে লন এর মতো একটা জায়গা, অনেক ঘাস হয়ে আছে সেখানে। আশ্চর্যের যে এই হোটেল তৈরির সব জিনিস এখানে মানুষ মাথায় করে নিয়ে এসেছে এই সম্পূর্ণ ট্রেক এর রাস্তা দিয়ে! এমন কি এখানে থাকলে তার সব খাবার সব কিছুই আসে ওই রাস্তা দিয়ে। নিমা জানালো এখানে রাত্রে অনেক সময় জংলী জানোয়ার চলে আসে। তবে সে যাই আসুক আমি একবার কল্পনার চেস্ট করলাম এখানে এক জ্যোৎস্না আলোকিত রাত্রিতে বসে, এই জঙ্গলের রূপ উপভোগ করতে কতই না ভাল লাগবে। অথবা এখানে এক সূর্যোদ্বয়, সত্যি এসব যেমন একেবারে কোনো স্বর্গীয় অনুভূতি।
বেলা প্রায় চারটে, এবার ফিরতে হবে। অনেকটা রাস্তা হেঁটে হিলে পৌঁছে তারপর গাড়ি চড়ে হোমস্টে ফেরা। পাহাড়ি জঙ্গলে অন্ধকার নাম খুব দ্রুত। আসবার সময় রাস্তায় দুই চার জনের সাথে দেখা হয়েছিল কিন্তু ফিরবার সময় কাউকে পেলাম না। অন্ধকার না হলেও বিকাল থেকে ঠান্ডা, কুয়াশা আর হাওয়া - এসব মিলিয়ে ফিরবার সময় যেন এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ হয়ে উঠলো এই জঙ্গলের রাস্তা। আমরা যখন গাড়ির কাছে ফিরলাম তখন প্রায় অন্ধকার। যদিও সময় মাত্র পাঁচ’টার একটু বেশি কিন্তু পাহাড়ি জায়গায় এর মধ্যেই দিনের আলো ফুরিয়ে গিয়েছে। ড্রাইভার মৃদু ধমক দিলো দেরি করবার জন্য। দেখলাম হিলে’তে যে কয়েকটি দোকান ছিল তারা সবাই দোকান বন্ধ করে ইতিমধ্যেই ফিরে গিয়েছে। শুধু ড্রাইভার গাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। ড্রাইভার জঙ্গলের রাস্তায় আর একটাও কথা বললো না, জঙ্গলের পথে বেশ জোরে গাড়ি হাঁকিয়ে দ্রুত জঙ্গল পার করলো। জঙ্গল পেরিয়ে আসবার পরে জানালো ওই জঙ্গলে রয়েছে প্রচুর জংলী জানোয়ার যা সন্ধ্যার পরে জেগে ওঠে। আমরা যে রাস্তা দিয়ে আমরা গিয়েছি এমনকি হিলের গাড়ি রাখার জায়গা বা টিকিট কাউন্টার এর আশেপাশেও ওরা চলে আসে। আমরা এতটা দেরি করে খুবই ভুল করেছি। সন্ধ্যার একটু পরে আমরা রিনচেনদের হোমস্টে তে পৌঁছে গেলাম।
বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১
গতকালের সারা দিনের অনেকটা পাহাড়ি পথচলা আমাদের খুবই ক্লান্ত করে দিয়েছিলো। রাত্রে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম আর উঠেছি প্রায় সকাল ৮ টা নাগাদ। ইতিমধ্যেই সব শেয়ার গাড়ি ওখরে থেকে চলে গিয়েছে জোড়থাং এর পথে। শেষ উপায় সকাল ৯ টার বাস নইলে এবার হয় প্রাইভেট গাড়ি বুক করতে হবে । পকেটের চাপ কমাতে আমরা বাসেই চড়ে বসলাম আর চললাম সেই প্রথম দিনের রাস্তা ধরে, প্রথমে জোড়থাং তার পর রুট বদলে দার্জিলিং হয়ে মিরিকের এর দিকে। সে অবশ্য আলাদা গল্প, সেটা না হয় আরো কোনোদিন বলবো।
—————
মুক্তবাক পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল এই ভ্রমণ গল্পটি, ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা।
